সিমেন্ট শক্ত হয় কেন? অনেকে ভাবেন পানি শুকিয়ে গিয়ে শক্ত হয়। আসলে ঠিক উল্টো। সিমেন্টের জন্য পানি শুকিয়ে যাওয়া সমস্যা, কারণ পানি লাগে বিক্রিয়ার জন্য।
সিমেন্ট আর পানির এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার নাম হাইড্রেশন (hydration)।
হাইড্রেশন মানে কী?
শুকনো সিমেন্টের দানায় থাকে C₃S, C₂S, C₃A ও C₄AF। পানি পেলে এরা বিক্রিয়া করে নতুন যৌগ তৈরি করে। এই নতুন যৌগগুলো একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে একটি কঠিন জাল তৈরি করে। এটাই শক্ত হওয়া।
প্রধান যৌগগুলো:
- C–S–H (calcium silicate hydrate): আঠার মতো কাজ করে। সিমেন্ট পেস্টের শক্তির বেশিরভাগ আসে এটি থেকে
- Ca(OH)₂ (calcium hydroxide, CH বা portlandite): শক্তিতে ভূমিকা কম, কিন্তু পরিবেশ ক্ষারীয় রাখে
- Ettringite: C₃A, জিপসাম ও পানির বিক্রিয়ায় তৈরি, শুরুর দিকের সেটিং নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
সরলীকৃত রূপে (সিমেন্ট সংকেতে) C₃S-এর বিক্রিয়াটি এরকম লেখা হয়:
উৎসের নোট: Taylor-এর Cement Chemistry (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯৭)-এ তাপের হার-বক্ররেখায় আবেশ-কালের পর একটি দ্বিতীয় শৃঙ্গ দেখানো হয়েছে। সিমেন্টের প্রসঙ্গে প্রায় ১৬ ঘণ্টায় একটি ছোট শৃঙ্গ নতুন ettringite গঠনের সঙ্গে যুক্ত বলা হয়েছে। দ্বিতীয় শৃঙ্গ আর সালফেট ফুরানোর সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তাই সেটি এখানে নিশ্চিত দাবি হিসেবে লেখা হয়নি। ক্যালরিমিটারের বক্ররেখা সিমেন্টভেদে বদলায়, তাই নিজের ডেটা থেকে মিলিয়ে নিন।
পাঁচ ধাপে হাইড্রেশন
হাইড্রেশনের সময় তাপ বের হয়। সেই তাপ মাপলে একটি বিশেষ আকৃতির বক্ররেখা পাওয়া যায়, যা সাধারণত পাঁচ ধাপে ভাগ করে বলা হয়।
১. দ্রবণ ও প্রথম বিক্রিয়া (dissolution): পানি মেশানোর সঙ্গে সঙ্গে কিছু আয়ন গলে যায়, আর C₃A ও জিপসাম বিক্রিয়া করে ettringite তৈরি শুরু করে। কিছুক্ষণের জন্য তাপ বেশ চড়ে ওঠে, তারপর কমে যায়।
২. সুপ্ত বা ডরম্যান্ট ধাপ (induction): বাইরে থেকে মনে হয় প্রায় কিছুই হচ্ছে না। তাপ কম। এই সময়টাতেই কংক্রিট মেশানো, বয়ে নেওয়া ও ঢালা হয়। তাই এই ধাপ আমাদের জন্য খুব দরকারি।
৩. ত্বরণ (acceleration): C₃S দ্রুত বিক্রিয়া করতে শুরু করে। C–S–H ও Ca(OH)₂ প্রচুর তৈরি হয়, তাপ বাড়ে। এই সময়েই পেস্ট শক্ত হতে থাকে।
৪. মন্দন (deceleration): তাপ কমতে থাকে, সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী দানাগুলোর চারপাশে তৈরি হওয়া স্তর বিক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয়।
৫. ধীর অবস্থা: বিক্রিয়া চলতেই থাকে, তবে খুব ধীরে। এই সময় শক্তি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।
সময়ের আনুমানিক ধারণা: প্রতিটি ধাপ কত ঘণ্টা স্থায়ী হবে, তা সিমেন্ট, পানি-সিমেন্ট অনুপাত, তাপমাত্রা ও অ্যাডমিক্সচারের ওপর নির্ভর করে, তাই এখানে নির্দিষ্ট ঘণ্টার হিসাব দেওয়া হলো না। তবে Taylor-এর বইয়ে কয়েকটি আনুমানিক মাইলফলক পাওয়া যায়: প্রায় ১৬ ঘণ্টায় নতুন ettringite-এর সঙ্গে যুক্ত একটি শৃঙ্গ, প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিপসাম ও সালফেট বেশিরভাগ ব্যবহৃত হয়ে যায়, এবং ২৮ দিনে C₃S-এর প্রায় ৭০% বিক্রিয়া করে। নির্দিষ্ট মানের জন্য প্রস্তুতকারকের ডেটা বা ক্যালরিমিটার পরীক্ষা দরকার।
তাপ কেন বের হয়?
সিমেন্ট ও পানির এই বিক্রিয়া exothermic, অর্থাৎ তাপ ছাড়ে। সাধারণ দেয়াল বা স্ল্যাবে এই তাপ সহজে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু মোটা কংক্রিটে, যেমন বড় ফাউন্ডেশন বা বাঁধে, ভেতরের তাপ আটকে থাকে। ভেতর গরম, বাইরে ঠান্ডা হলে কংক্রিটে ফাটল ধরতে পারে।
তাই বড় কাজে কম তাপ ছাড়ে এমন সিমেন্ট বা মিশ্রণ বেছে নেওয়া হয়। কোন সিমেন্ট কতটা তাপ ছাড়ে, তা তার খনিজ গঠন ও ফাইননেসের ওপর নির্ভর করে। এই বিষয়ে আলাদা লেখা থাকবে।
হাইড্রেশন থামে কখন?
পানি ফুরিয়ে গেলে বা অবশিষ্ট সিমেন্টের কাছে পানি পৌঁছাতে না পারলে। তাই কংক্রিট ঢালার পর কয়েক দিন ভিজিয়ে রাখা বা ঢেকে রাখাকে curing বলে। এটি শুধু নিয়ম রক্ষা নয়, শক্তি পুরোপুরি পেতে হলে এটা জরুরি।
সারকথা
- হাইড্রেশন মানে সিমেন্ট ও পানির রাসায়নিক বিক্রিয়া, শুকানো নয়
- প্রধান যৌগ C–S–H, Ca(OH)₂ ও ettringite
- তাপ নির্গমনের বক্ররেখায় পাঁচটি ধাপ দেখা যায়
- মোটা কংক্রিটে তাপ জমে সমস্যা করতে পারে, আর curing শক্তির জন্য জরুরি